মুক্তিযুদ্ধের খিচুড়ি


মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। দেখিনি বললে ভুল হবে। দেখেছি অন্যদের চোখে আর ইতিহাস বইতে। প্রশ্ন করে জানতে চেষ্টা করেছি কেমন ছিল ৭১ এর মানুষদের জীবন যুদ্ধ। কখনো ছুটে গিয়েছি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়া কোন মুক্তিযোদ্ধার কাছে।

৭১ এ আমার মা ছিলেন ভারতে আশ্রয় নেওয়া কোটি মানুষের একজন। দেশ ছাড়ার সময় কেউ নিশ্চিত ছিলেননা আদৌ তারা সীমানা অতিক্রম করতে পারবেন কিনা অথবা পারলেও স্বাধীন দেশে আবার ফিরতে পারবেন কিনা। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে যে মানুষেরা জীবন বাঁচাতে ভিনদেশে পারি দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আমার মা।

ছোট থেকেই বিভিন্ন সময়ে মার কাছ থেকে জেনেছি এবং জানছি তখনকার শরণার্থী শিবিরের কথা। জেনেছি শরণার্থী শিবিরে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবার গল্প।

তৎকালীন ভারত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যুদ্ধ শুরু হলে শরণার্থী ঝামেলা হবে ভারতের জন্য। কিন্তু কতটা ঝামেলা হতে পারে তা ইন্দিরা গান্ধীর কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জুনের মাঝামাঝি সময়েই ভারতে শরণার্থী সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যার সংখ্যা পরবর্তীতে কোটিতে পৌছে।

শরণার্থী শিবিরে রোগ-শোক লেগেই থাকতো। এতো মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করা ছিল নিঃসন্দেহে কঠিন। ছিল চিকিৎসার সমস্যা, খাবার সমস্যা আর এতো মানুষের স্থান সংকুলানের ব্যাপারতো রয়েছেই।

শরণার্থীরা ভারতের প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিলেও তা সামলানোর ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ছিলনা। ফলে শরণার্থীদের একটা সংখ্যা ভারতের অন্যান্য স্থানে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীর সংখ্যার তুলনায় তা ছিল যথেষ্টই নগন্য।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে শরণার্থী শিবির গুলোতে দেওয়া হতো চাল, ডাল, তেল, লবন, মরিচ ইত্যাদি যা যা লাগে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দেওয়া হতো খিচুড়ি। চাল-ডালের থেকে যেখানে পানির পরিমাণ থাকতো অনেক বেশি। একেবারেই পাতলা করে রান্না করা হতো। পিয়াজ বড় বড় করে কেটে দেওয়া হতো খিচুড়ির সাথে। মিষ্টি কুমড়া, বরবটি সিম, পটল ইত্যাদি সবজি মেশানো হতো খিচুড়িতে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে এবং স্বাধীনতার পরেও যেসব বাংলাদেশি পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী হিসেবে থেকেছেন প্রতিটা দিন তাদের এই খিচুড়ি খেয়েই ক্ষুধা মেটাতে হয়েছে। রোজ খেলেও এই খিচুড়িই তাদের কাছে লাগতো অমৃতের মত!

আমার নিজেরও খিচুড়ি অসম্ভব প্রিয়। ছোটবেলা থেকেই প্রায়ই মার কাছে আবদার করতাম আমাকে খিচুড়ি রান্না করে দেবার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের খিচুড়ি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s