উল্টো যাত্রা


-আমার চশমাটায় ময়লা পড়েছে। একটু মুছে দেবে?

-এক চশমা কতবার মুছতে হয় দিনে? একটু পর পর চশমা মুছে দাও চশমা মুছে দাও। এদিকে ছেলে যে এখনো বাসায় ফেরেনি সে খেয়াল আছে? এখন যে অবস্থা। আমার আর কিছুই ভাল লাগছেনা।

-তা তো বুঝলাম। কিন্তু চশমাটায় এতো ময়লা পড়ে। কিছু দেখতে পাইনা।

-ময়লা চশমায় নয়, ময়লা পড়েছে তোমার চোখে।

দবির সাহেব আর কিছু বলেন না। চশমাটা হাতে নিয়ে বসে থাকেন। এক সময় সরকারী চাকুরি করতেন। কিন্তু এখন শরীরের বা পাশ প্যারালাইজড হয়ে বাসাতেই পরে থাকেন। ইদানিং চোখেও ভাল দেখছেন না তিনি। স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। একমাত্র ছেলে আসাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এখন যে সে কখন কোথায় ঘুরে বেড়ায় তা দবির সাহেব নিজেও জানেন না। দেশের অবস্থা ভাল নয়। যখন যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলা হচ্ছে। আর তরুণ ছেলেরা যেন ওদের শত্রু। ছেলেকে বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও কথা শুনতে চায়না সে। দবির সাহেব আসাদকে কতবার বলেন, ‘বাবা এখন দেশের অবস্থা ভাল নয়। কোথাও যাস না’। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

দবির সাহেবের মেয়েটা অবশ্য খুব লক্ষ্মী। এ কথা উনি নিজেই সবাইকে বলেন। আলো, ক্লাস নাইনে পড়ে মেয়েটা। পড়ালেখাতে যেমন ভাল, গানের গলাও তার খুবই ভাল। দবির সাহেবের বিশ্বাস মেয়ে একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে।

-বাবা, আমাকে দাও। আমি মুছে দিই তোমার চশমা।
বাবা-মায়ের কথা শুনে পড়ার টেবিল থেকে উঠে এসেছে আলো। দবির সাহেব চশমাটা আলোর হাতে দিলেন। আলো চশমা মুছে বাবার হাতে দিয়ে আবার নিজের ঘরে চলে গেলো।
বাইরে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ শোনা গেল মনে হয়? দবির সাহেবের বুকটা কেঁপে ওঠে।

-আসাদের মা। আসাদের মা কোথায় তুমি? মা আলো…

দবির সাহেবের ডাকে রান্নাঘর থেকে তার স্ত্রী ছুটে আসেন।

-হিশশশ…চুপ থাকো। মনে হয় ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালিয়েছে। আল্লাহ, ছেলেগুলোকে রক্ষা করো। কিন্তু আসাদটা যে কই গেলো। এখনো যে আসেনা।

-অপদার্থ একটা ছেলে। কোথায় এই সময় বাসায় থাকবে তা না করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

দবির সাহেবের খুব দুশ্চিতা হচ্ছে।

-ভাইয়া কে অপদার্থ বলো না বাবা। ভাইয়া, দেশের জন্য কাজ করছে।

আলো জিভে কামড় দেয়। আসাদ যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে তা আলো ছাড়া আর কেউ জানেনা। বাবা-মা দুশ্চিন্তা করবেন তাই আসাদের কড়া নির্দেশ।

-দেশের জন্য কাজ করছে মানে? মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দেয়নি তো?

-আমারও মনে হয়। ওর মধ্যে কেমন জানি অস্বস্তি দেখছি গত কিছুদিন ধরে। আলো, তুই জানিস কিছু?

আলো জানালার বাইরে উকি দেয়। একটু পর পর আগুন জলছে। সাথে গুলির আওয়াজ। পর্দা টেনে দিয়ে বাতি নিভিয়ে দেয় সে।

-আম্মু, খুব ভয় হচ্ছে আমার।

মেয়ের মাথায় হাত রাখেন দবির সাহেব।

এখন গোলাগুলির শব্দ অনেক কমে গেছে। এক পাশ থেকে আসছে। অন্য পাশ একরকম নীরবই বলা যায়। একটু পর বিজয় উল্লাস শোনা যায়। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ!’

দবির সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বাইরে পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের দোসরদের উল্লাস শোনা যায়। আর এই বাড়িতে কোন টু শব্দটি কেউ করছে না। সবাই চুপ করে বসে আছে।

-বাবা, এখন কি হবে?

আলো নীরবতা ভাঙে।

-জানিনা মা। কিচ্ছু জানিনা। কেন যে এসব দেখতে হচ্ছে। অসার বস্তুর মতো পরে আছি এখানে। আমি তো কোন কাজও করতে পারিনা। মরে গেলেও বাঁচতাম।

-এসব কি বলছো বাবা? ছিঃ! খারাপ কথা বলতে হয়না।

-উফ, তোমরা থামবে? এখন কথা বলা ঠিক হচ্ছেনা।

মায়ের কথায় ভুল বুঝতে পারে আলো। ঠিক হচ্ছেনা এখন কথা বলা। দবির সাহেবও থেমে যান।

হঠাৎ বাড়ির দরজায় কে যেন কড়া নাড়ে।

বাড়ির তিনটি মানুষের নজরই এখন দরজার ছিটকানির দিকে। কে আসলো এই সময় হঠাৎ?
দরজার কড়া নাড়ার শব্দ আতংক সৃষ্টি করেছে। আসাদের মা এগিয়ে যান দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই হুরমুর করে প্রবেশ করে আসাদ। ঢুকেই ছিটকানি লাগিয়ে দেয় সে। সাদা গেঞ্জি রক্তে লাল হয়ে গেছে তার।

-মা!

আসাদের মার মুখে কোন কথা নেই। আলো দৌড়ে এসে তার ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে।

-তুমি ঠিক আছো তো ভাইয়া?

-আমার কিছু হয়নি। সজল আর নেই। মাথায় গুলি লেগেছে ওর। রাতুল, কালামও আহত। অতুল ধরা পড়েছে। আমি, ফয়সাল আর মামুন ভাই পালাতে পেরেছি। বাকিদের কথা জানিনা।

মাকে জড়িয়ে ধরে আসাদ। মা আচল দিয়ে ছেলের মুখ মুছে দেন। ছেলের চোখে পানি। দবির সাহেব আসাদের কাছে আসতে চেষ্টা করেন। বুঝতে পেরে আলো তার কাছে ছুটে যায়।

-তুমি উঠো না বাবা। পরে যাবে।

আসাদ দবির সাহেবের কাছে আসে। দবির সাহেব পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত রাখেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বুট দিয়েও লাথি মারছে।

-দরওয়াজা খোলিয়ে।

আসাদের মা ছেলের কাছে ছুটে আসেন।

-বাবা, পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যা তুই। দেরী করিস না। তাড়াতাড়ি ওঠ।

আসাদ দেরী করেনা। তাড়াতাড়ি বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যায় সে। ওদিকে পাক সেনারা দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করছে।

আসাদ পিছনের বাগান দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। পিছনে ফিরেও তাকাচ্ছে না সে। যতো তাড়াতাড়ি এই এলাকা থেকে সরে পরা যায়। দৌড়াতে দৌড়াতে পরে যায় সে।

গলা শুকিয়ে গেছে। পানি চাই। কিন্তু এখানে পানি কে খাওয়াবে তাকে। মাটিতে শুয়ে পরে সে। মাথায় সাত-পাঁচ ভাবনা ঘুরছে।

আচ্ছা, অতুল সব বলে দেবে না তো। তাহলে তো পুরো দলটাই ধরা পরে যাবে। ফয়সাল আর মামুন ভাই কোথায় এখন কে জানে। সজলটা চলে গেছে। এখন? খালাম্মা কে কি বলবো আমি…

ভাবতে থাকে আসাদ। হঠাৎ কি মনে হয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। দৌড়াতে শুরু করে। যে পথ ধরে সে এখানে এসেছে, সেই পথেই। বাড়ির দিকে।

ছুটতে ছুটতে বাড়ির পিছনের দরজায় এসে দাঁড়ায় সে। কোন শব্দ নেই। তবে কি জানোয়ারগুলো চলে গেছে?
বারান্দায় দাড়াতেই সারা শরীর ছিমছিম করে ওঠে তার। ধীর পায়ে একটু এগুতেই টের পায় কোন এক অজানা শক্তি তাকে টেনে ধরেছে।

বাবার চশমা! ভেঙে পরে আছে মেঝেতে। পাশেই দবির সাহেবের অসার দেহ। আসাদ তার মাকে দেখতে পায়। মার চোখ এখনো বন্ধ হয়নি। এই চোখ কি কিছু বলতে চাইছে?

পুরো পৃথিবীটা আসাদের কাছে স্থির মনে হয়। বাবা-মা নেই, বিশ্বাসই করতে পারেনা সে।

কিন্তু আলো? আলো কোথায়? আসাদ হন্য হয়ে আলোকে খুজতে থাকে। কোথায় তার আদরের ছোট বোনটি?

সামনের দরজার দিকে আসাদ তাকায়। দরজা এক মুখ হা করে আছে। তবে কি আলোকে ওরা নিয়ে গেলো?
কল্পনা করতেই মাথায় রক্ত উঠে যায় আসাদের। আলোর খাটের তলায় রাখা একটা বস্তা বের করে সে। কি যেন খুঁজতে থাকে।

বাবা-মায়ের পা ছুঁয়ে দৌড়ে বেড়িয়ে যায় সে। গন্তব্য আর্মি ক্যাম্প। ঘন্টা খানেক আগেই যেখান থেকে পরাজয় বরণ করে এসেছে সে।

আগে এখানে একটা প্রাইমারি স্কুল ছিল। এই স্কুলেই ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে আসাদ। আলোও প্রাইমারীর গন্ডি পেড়িয়েছে এই স্কুল থেকেই। এখন সেই স্কুলেই ক্যাম্প খুলেছে পাক বাহিনী। যে স্কুল স্বপ্ন গড়ার জন্য নির্মিত হয়েছিল এখন সে স্কুলে কতো পরিবারের স্বপ্ন যে রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে তা জানতে পারছেনা কেউ।

ক্যাম্পের গেটে পৌছতেই দুজন পাক আর্মি বন্দুক তাক করে আসাদের দিকে। আসাদ ক্যাম্পের ভিতরে প্রবেশ করে। আর্মি দুজনও বন্দুক তাক করে আসাদের পিছন পিছন যায়। ভেতরে যেতেই মেজর আসলাম তার দিকে তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দেয়।

-আলো কোথায়?’

-তুমহারা বেহেন কো তো হাম বহুত পেয়ার মে রাখা হ্যায় আসাদ ভাই। হামলোগ ইতনা পেয়ার কারা কে ও আব আরামসে সো রাহি হ্যায়।’

মেজর আসলামের সাথে সাথে অন্যান্য পাক সেনারাও জোরে হেসে ওঠে। তাদের হাসি যেন আসাদের শরীরের প্রত্যেকটা কোষ ভেদ করে আসছে। দাড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলে সে। হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বসে পরে সে।

আসাদকে ভেঙে পরতে দেখে সব পাক আর্মিরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পরে। মেজর আসলাম আসাদের কাছে আসেন। আসাদের কাঁধে হাত রাখেন।

-ও ঠিক হ্যায় মেরে দোস্ত। টেনশন কারনে কি কই জরুরাত নেহি। চালো, রাতমে হাম সাব মিলকার উসকো বহুত মোহাব্বত কারুঙ্গা। আরে উঠোনা মেরে ইয়ার। বাংলা কি শের হো না তুম! উঠো উঠো!

আসাদ উঠে দাড়ায়। কিন্তু তার মুখে হাসি। চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছে। আসাদের হাতের দিকে তাকিয়ে পাক আর্মিরা সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

আসাদের এক হাতে গ্রেনেডের পিন ধরে রেখেছে।

কয়েক জন পাক আর্মি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু খুব বেশি সময় তাদের হাতে ছিলো না। মুহূর্তেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ক্যাম্পটি ধুলোয় মিশে যায়। ধুলোতেই মিশে যায় আলো আর আসাদের চোখের জল।

beautiful-Bangladesh-23

One response to “উল্টো যাত্রা

  1. পিংব্যাকঃ উল্টো যাত্রা | যুক্তিবাদী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s