একাত্তুরের গল্প


লিলিকে ৩ জন পাক সেনা জোর করে ঘরে নিয়ে দরজা আটকে দিয়েছে।অনেকক্ষণ হয়ে গেছে তবুও দরজা খুলছেনা।প্রথম দিকে লিলির কান্না চিৎকার দরজা ভেদ করে রফিক সাহেবের কানে আসলেও এখন কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা।বরং ঘরের ভেতর থেকে পাক সেনাদের বিকৃত হাসি উল্লাস দরজার এপাশে আসছে।বাইরে আরও ২ জন সেনা অপেক্ষা করছে।

লিলি রফিক সাহেবের স্ত্রী।লিলি আর একমাত্র সন্তান ফরহাদকে নিয়ে রফিক সাহেবের ছোট্ট পরিবার।ফরহাদের বয়স মাত্র ১ বছরে পড়ল সেদিন।রফিক সাহেবের ছোট ভাই সোহেলকে খুঁজতে এসেছে পাক আর্মি আর তাদের দোসরেরা।সোহেল নাকি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে।

হঠাৎ দরজা খুলে গেল।মেজর আসলাম বের হলেন ঘর থেকে।বের হতে না হতেই আরও দুজন পাকি সেনা ঘরে ঢুকল।তাদের বীভৎস হাসি রফিক সাহেবের সহ্য ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেল।রফিক সাহেব লিলিকে আটকে রাখা ঘরের দিকে ছুটে যেতেই তার পায়ে গুলি করল এক পাকি আর্মি।পড়ে গেলেন রফিক সাহেব।

‘ক্যায়া ফায়দা আপনি নাঙ্গা বিবিকো দেখকার?তুমভি এক্সাইটেড হোগায়া ক্যায়া?হা হা হা…’

রফিক সাহেবের মুখে কোন কথা নেই।মানুষ এতো বর্বর হতে পারে?

‘চিন্তা মাত কারো।হাম জেন্টালম্যান লোক হ্যায়।কোই বেত্তামিজি নেহি কিয়া তুমহারা নাঙ্গা বিবিকে সাথ!হা হা হা…’ মেজর আসলামের হাসির সাথে অন্যান্য পাকি সেনারাও হাসছে।

‘ইসকা বাচ্চা কো লেয়াও’।

মেজরের হুকুম পালন করতে একদমই দেরি হলনা।ছোট্ট ফরহাদকে নিয়ে আসলো ওরা।ফরহাদ কি বুঝেছে কে জানে,একটা শব্দও করছেনা।চোখ খুলে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে একভাবে। মেজর ফরহাদকে এক হাত দিয়ে ধরলেন।

‘আব বাতাও তুমহারা ভাই সোহেল মুক্তি কাহা হ্যায়?বোলো হাম তুমকো ছোর দেগা।তুমহারা বিবি মেরেকো বহুত পসান্দ হুয়া,খোদা কি কাসাম।তুম সিরফ বোলো সোহেল মুক্তি কাহা হ্যায়’।

‘আমি জানিনা।আমি সত্যি জানিনা’। ‘তুম সাব বাঙালি লোক এক জ্যাসা। ওকে।কই প্রবলেম নেহি।মাত বাতাও।’

ছোট্ট ফরহাদকে উপরের থেকে নিচে আছড়ে ফেললেন মেজর।মুহূর্তের জন্য রফিক সাহেবের পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছেননা,দেখতে পাচ্ছেননা।রফিক সাহেবের চোখের জল একাধারে পড়তে লাগল যা ফরহাদের ভেসে যাওয়া রক্তের সাথে মিশছে।

‘চিন্তা মাত কারো।বিবি হ্যায় তুমহারি,বাচ্চা ভি প্যায়দা হো জায়েগি।আর ও বাচ্চা তুমহারা জেয়সি নালায়াক নেহি হোগা।সাচ্চা পাকিস্তানি হোগা ও।ঠিক হ্যায় ক্যায়া?’

রফিক সাহেব চেয়ারে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

‘ওকে মিঃরফিক ,হাম তুমকো বাহুত তাকলিফ কিয়া।হাম বহুত শারমিন্দা হ্যায় ইস লিয়ে।হা হা হা… হাম আবিভি তুমকো ছোর সাক্তে।সিরফ ইকবার বোলো পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

রফিক সাহেব চেয়ার ছেড়ে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।চোখের জল মুছে ফেললেন।চিৎকার করে বললেন,

‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ।জয় বাংলা…’

মুহূর্তে একঝাক গুলি এসে ঝাঁজরা করে দিল রফিক সাহেবের বুক।রফিক সাহেবের বুকের রক্ত মিশেছে তার ছেলে ফরহাদের রক্তের সাথে…

One response to “একাত্তুরের গল্প

  1. পিংব্যাকঃ একাত্তুরের গল্প | যুক্তিবাদী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s