জীবন থেকে নেওয়া : ১


ঘটনা ১:

ল্যাব এইড থেকে ATCL বাসে আসছিলাম।পহেলা ফাল্গুনের জন্য রাস্তায় বিশাল জ্যাম।বাসে অনেক ভিড়।হেল্পার কাউকে উঠতে দিচ্ছেনা।কাউকে উঠালেই লোকজন চেচাচ্ছে।কলাবাগানের মাঠের সামনে বাস জ্যামে আটকা পড়ল।অনেকে উঠতে চেষ্টা করছে কিন্তু হেল্পার কাউকেই উঠাবেনা।তার এক কথা ২০ টাকার জন্য ৪০ টাকার গালি শুনতে পারবেনা।একজন বোরখা পড়া নারীও বাসে উঠতে চেষ্টা করছিলেন।আমাদের বাসের হেল্পার তাকে না করায় তিনি অনুনয়ের সুরে বললেন,ভাই  ১ ঘণ্টা ধরে দাড়িয়ে আছি।আমি মেয়ে মানুষ,সারাদিন অফিস করেছি।অনেক কষ্ট হচ্ছে দাড়িয়ে থাকতে।তার কথায় হেল্পার তাকে বাসে উঠালেন।নতুন যাত্রী উঠানোয় অনেকে হেল্পারকে গালি দিলেন।একজন বললেন মেয়ে মানুষ পেয়ে হেল্পারের মাথা খারাপ হয়েছে।
হেল্পার যখন ঐ ভদ্রমহিলার কাছে ভাড়া চাইলেন।মহিলা বললেন,কিসের ভাড়া ঠিক মত দাঁড়ানোর জায়গা দাওনাই।পরে অনেক অনুরোধের পর ভদ্রমহিলা স্টুডেন্ট ভাড়া দিলেন।হেল্পার বললেন,হায়রে আপা!বাসে উঠার সময় চাকরি করেন আর ভাড়া দেওয়ার সময় স্টুডেন্ট!

ঘটনা ২:

৮ নাম্বার বাসে করে যাচ্ছি।বাসে এতটুকুন জায়গা খালি নেই।লোকজন বাসের দরজার কাছে ঝুলছে।ভাগ্য ভাল আমি আর আমার ছোট ভাই রায়হান সিট পেয়েছি।দুইজন হেডফোন শেয়ার করে গান শুনছি বিরক্তিকর একঘেয়ে জার্নিকে ভুলে থাকার জন্য।হঠাৎ চিল্লাচিল্লির শব্দ শুনে হেডফোনটা সরালাম।

ঝগড়া চলছে।বাস কন্ডাকটারের সাথে এক মধ্যবয়সী যাত্রীর লেগেছে।কন্ডাকটার ৫ টাকা ভাড়া চাচ্ছে কিন্তু যাত্রী ৪ টাকা দিচ্ছেন।যাত্রী বলছেন ভাড়া ৪ টাকা কিন্তু কন্ডাকতটার মানতে নারাজ,ভাড়া ৫ টাকার এক টাকাও কম নেই।কথার পিঠে কথা চলছে।কেউ কিছু বলছেনা,কিন্তু সবাই যথেষ্টই বিরক্ত।

হঠাৎ কন্ডাকটারের গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিলেন মধ্যবয়সী ওই যাত্রী।কন্ডাকটার নাকি মানুষ চেনেনা।কার সাথে কথা বলছে জানেনা।শুধু থাপ্পড় দিয়েই চুপ করে থাকলেননা তিনি,আরও শাসিয়ে দিলেন সামনে যেয়ে নাকি মজা দেখাবেন।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে এরকম একটা ঘটনা ঘটল বুঝতে পারছিলামনা কি করা উচিত।তাছাড়া বাস ফার্মগেটে চলে এসেছে,নামার তাড়াও আছে।বাস থেকে নেমে পার্কের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম হঠাৎ দাড়িয়ে রায়হানকে বললাম,আমরা যা করেছি তা কি আসলেই ঠিক করেছি?কন্ডাকটার তার কাজ করছে,যাত্রী না মানতে পারলে প্রতিবাদ করুন।কিন্তু তাই বলে গায়ে হাত তোলার অধিকার তো তার নেই।আজকে যদি ওই কন্ডাকটার ওই যাত্রীর গায়ে পাল্টা হাত তুলতেন?তাহলে?

রায়হান ও বুঝতে পারল ব্যাপারটা।বুঝলাম আমাদেরও কিছু করার  ছিল।বাসে যারা রেগুলার যাতায়াত করেন তাদের কাছে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়।ঠিক করলাম আজকের পর আর কোনদিন এভাবে চুপ করে থাকবনা।প্রতিবাদ করবো,যা হবার হবে।

বেশি দেরি করতে হলনা আমাদের।পরেরদিন আবার ওই একই ঘটনা।তবে এবার আর ৮ নাম্বার বাস নয়।মতিঝিলগামী বাস বাহনে ঘটল ওই একই ঘটনা।এখানে কন্ডাকটার ১০-১২ বছরের একটি শিশু।চরিত্রের আরেকজন ৩৫-৪০ বছরের  একজন যাত্রী।কন্ডাকটার ভাড়া চাইছে ১০টাকা আর যাত্রী দিয়েছেন ৫টাকা।ব্যাস লেগে গেল।কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শিশুটির গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন ওই যাত্রী।ঠিক তার পিছনের সিটেই বসেছিল রায়হান।সাথে সাথে দাড়িয়ে গেল সে।

আপনি ওকে মারলেন কেন?আপনি ভাড়া না দিতে পারলে সেইটা মুখে বলেন।গায়ে হাত তুললেন কেন?

‘আরে মিয়া আপনার সমস্যা কি?এগুলারে না মারলে বেয়াদবি করতেই থাকে।লোকাল বাসের মত লোক উঠাইসে  আর ভাড়া চায় সিটিং এর।’বললেন ওই যাত্রী।

‘তাই বলে আপনি ওকে মারলেন কেন?আর এখানে কোন সিটিং-লোকাল নেই।আপনি…’

‘আরে ছোট পোলা তর্ক করসে মারসি।আপনার এতো সমস্যা কিসের?’রায়হানকে থামিয়ে দিয়ে বললেন যাত্রী।

‘আপনার ছোট বলে আপনি গায়ে হাত তুলবেন?তাহলে আমিও তো আপনার ছোট,এখন আপনি আমার গায়ে হাত তোলেন?’

এতক্ষণে অন্য যাত্রীদেরও হুঁশ ফিরেছে।আরও কয়েকজন এই ঘটনার প্রতিবাদ করলেন।শিশুটি তখনও কাঁদছে।রায়হানকে আর কিছু বলতে হলনা।

‘এই বাচ্চার কাছে মাফ চান আর পুরো ভাড়া দেন।’দাড়িয়ে থাকা এক যুবক বললেন।

‘কিসের ভাড়া আর কিসের মাফ?এইগুলারে মারাই উচিত…’তাও নিজের ভুল স্বীকার করলেননা ঐ লোক।

‘ওই ভাইরা,ব্যাটারে নামায় দেন তো বাস থাইকা…’আশেপাশের কয়েকজনকে বললেন যুবক।

আর কোন কথা বলার সুযোগই পেলেননা।মুহূর্তের মধ্যে বাস থেকে নামিয়ে দিল অন্যরা।

চড় খাওয়া শিশুটির দিকে তাকাল রায়হান।

চোখের পানি মুছে শিশুটি হাসছে!

ঘটনা ৩:

ফারিকে কলেজ থেকে বাসায় দিয়ে আসলাম।অনেক দেরি হয়ে গেছে।ফিরতে ফিরতে বিকাল হয়ে যাবে।বনশ্রী থেকে শ্যামলীর ডাইরেক্ট বাস নেই।তরঙ্গ লিংক মোহাম্মদপুর পর্যন্ত গেলেও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তরঙ্গ লিংকের দেখা পেলামনা।

বেঙ্গল নামের এক বাস আসল।আগারগাও পর্যন্ত যেতে পারবো এই বাসে।গুলশান-বাড্ডা-মহাখালী হাজার জায়গা ঘুরে যাবে জেনেও ওঠে পড়লাম বাসে।

একদম পিছনের সিটে জায়গা পেলাম।একটা মাদ্রাসা পড়ুয়া ১২-১৩ বছরের শিশু বাসে উঠে সবার কাছে একটি লিফলেট ধরিয়ে দিল।আমার হাতেও একটা দিল।পড়ে জানতে পারলাম ওর বোনের বিয়ের জন্য টাকা দরকার।ওয়ালেট থেকে ১০ টাকার একটা নোট বের করলাম ওকে দেওয়ার জন্য।

‘ভাই টাকা দিয়েননা…দাঁড়ান।’আমার পাশের সিটেই বসা একজন বললেন।

টাকাটা হাতেই রাখলাম।বুঝলামনা কি করবো…

‘ভাই কেউ এরে টাকা দিয়েননা…।ওই পিচ্চি এদিক আয়…’সবাইকে টাকা না দিতে অনুরোধ করলেন উনি।

‘পিচ্চি এদিক আসতে কইলামনা তরে?’

ছেলেটা কাছে আসতেই ওর দুইহাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।

‘তরে আমি এই কাম করতে মানা করিনাই?ফাইজলামি পাইসশ?ধান্দাবাজি কর?’

চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেটি।মুখে কোন কথা নেই।

‘ভাই,এই পোলারে আমি একবছর ধরে না করতেসি।একবছর ধরে অর বইনের বিয়ার কথা কইয়া টাকা চায়।গত সপ্তাহেও না করসি একবার।টাকা দিয়া কইসিলাম এই কাম যেন আর না করতে দেখি।তাও হারামজাদা এই কাম করতেসে।’সবার উদ্দেশ্যে বললেন।

‘মারেন বদমাইশটারে।হারামজাদারা ব্যাবসা পাইসে…’আরেকজন বললেন।

‘উহু মারনের দরকার নাই।এরে আমি পুলিশে দিমু।হারামজাদার শিক্ষা হওয়ার দরকার।পুলিশের বাড়ি খাইলে যদি ঠিক হয়…’বললেন আমার পাশের সিটে বসা লোকটি।

‘সার,ভুল হইয়া গ্যাসে।আর এমন হইবনা।মাফ কইরা দেন সার।’এতক্ষনে যেন হুঁশ ফিরল ছেলেটির।পাসে বসা লোকটির পা জড়ায় ধরে মাফ চাইলো।চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝরছে ছেলেটির।

ছেলেটির কান্না দেখে অনেকেরই মায়া লাগল।এবারের মত ছেড়ে দিতে বললেন।

‘আর এমন করবিনা ঠিক আসে?ধান্দাবাজি না কইরা পড়ালেখা কইরা মানুষ হ।সবাই কইসে দেইখা তরে আজকে ছাইড়া দিলাম।কিন্তু আরেকদিন যদি এইরকম দেখি তাইলে কিন্তু তরে পুলিশে দিয়া দিমু।’

ঘাড় নামিয়ে বাস থেকে নেমে গেল ছেলেটি।

জানালা দিয়ে তাকালাম,ছেলেটা চলে যাচ্ছে।

১০টাকার নোটটা আমার হাতে ধরা।

ঘটনা ৪:

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরে বাসে উঠতে পারলাম।কোনরকমে ড্রাইভারের পিছনে জানালা ধরে দাড়িয়ে আছি।বাসে প্রচণ্ড ভিড়।সিট খালি নেই এমনকি সংরক্ষিত ৯টি সিটের প্রথম ৩টিতে পুরুষরা বসে আছে।সাইন্সল্যাবে একজন মধ্যবয়সী নারী উঠলেন দুই হাতে দুটি ব্যাগ।দরজার ভিড় ঠেলে মহিলা সিটের কাছে আসতেই দেখলেন ওগুলোও পুরুষদের দখলে।

‘এই যে ভাই এটাতো মহিলা সিট…’মহিলা সিটে বসে থাকা পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা।

মহিলার কথা শুনেও না শোনার ভান করে বসে রইলেন পুরুষেরা।ভালকরে লক্ষ্য করলাম।তিনজনের দুইজনই ২০/২২ বছরের যুবক,আরেকজন ৪০এর কাছাকাছি হবে।পোশাক দেখে ভদ্রঘরের মানুষই মনেহয়।

‘ভাই আপনারা তো মহিলা সিটে বসে আছেন।’আবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা মধ্যবয়সী নারীর।

এবারেও কোন লাভ হলনা।শুনেও না শোনার ভান করে বসে আছে ৩ জন।

‘এইযে,আপনারা মহিলা সিট ছাড়েন।’যথেষ্টই বিরক্তি নিয়ে বললেন মহিলা।

‘মহিলা সিট আবার কি?আপনারা মহিলারা যে পুরুষের সিটে বসে আছেন।আগে ওইগুলা খালি করেন’।বসে থাকা একজন ভদ্রলোক বললেন।

‘আরে সিটেই যদি বসতে হয় তাইলে সিএনজি কইরা জাননা ক্যান?লোকাল বাসে যে আগে বইসা পারে…’

অনেকক্ষণ হল।এবার কিছু করার দরকার।ভিড় ঠেলে ওই সিটগুলোর কাছে আসলাম।

‘ভাই সিট ছাড়েন।’প্রথমজনকে বললাম।

‘ভাই আমি ক্যান ছারুম?আরও তো ২জন বইসা আছে।ওনাদেরকে ছাড়তে বলেন।’

‘আপনি ছাড়েন আগে।অন্যরাও ছাড়বেন মহিলা উঠলে’।

‘কিসের সিট ছাড়বো!মহিলারা যে বইসা আছে পুরুষগো সিটে?’একদম জানালার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন।

‘ভাই,বাসে পুরুষদের জন্য কোন নির্দিষ্ট সিট নেই।৯টি নারী/শিশু/প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আর বাকি গুলো কমন।সংরক্ষিত সিট থাকা মানে এই নয় মহিলারা কমন সিটে বসতে পারবেনা।’

কথা শেষ হবার আগেই একজন(প্রথমজন) সিট ছাড়লেন।

ঘটনা ৫:

ঢাকার সেন্ট জোসেফের ছাত্র ছিলাম তখন।ক্লাস শেষে লোকাল বাসে করে ফিরতাম আমার জোসেফে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু নজরুলের সাথে।পড়াশুনা নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস ছিল নজরুল।ক্লাসেও যা কথা বলার আমার সাথেই বলতো।একেবারেই শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিল নজরুল।দুষ্টামি-বাঁদরামি একেবারেই করতোনা।

ক্লাস শেষে একসাথে বাসে ঝুলতে ঝুলতে ফিরতাম আমরা।বাস থেকে নামার সময় কখনই বাস থামাতনা ড্রাইভার।

“বাম পাও আগে দিয়া নামেন!”এই কথা হেল্পারের কাছে শোনেনি এমন কেউ মনেহয় ঢাকা শহরে নেই!বাসের গতি কমালে ‘বাম পাও আগে দিয়াই’ নামতে হতো আমাকে!

একদিন খেয়াল করলাম আমি যেখানে ‘বাম পাও আগে দিয়া’ নামি সেখানে নজরুল যে বাসেই উঠুকনা কেন ও নামার সময় বাস থামায় ড্রাইভার।‘বাম পাও আগে দিয়া’নামতে হয়না নজরুলকে!

এভাবেই চলতে লাগলো।আমাদের দুইজনের জনের বাসা দুই জায়গায় বলে একসাথে নামা হতোনা আমাদের।কোচিং থাকলে নজরুল আগে নামতো,কোচিং না থাকলে আমার পরে।

একদিন নজরুলের  সাথে বাস থেকে নামার সৌভাগ্য আমার হল!নজরুলের সাথে নামলাম বলে আমাকেও ওইদিন ‘বাম পাও আগে দিয়া’ নামতে হলনা।কিন্তু নজরুল বাস থেকে নামার সময় কেন বাস থামে সেই রহস্য ওইদিন ভেদ করতে পেরেছলাম।বাস থেকে নামার আগে ব্যাটা হেল্পারকে একটা কথা বলে সবসময়।আর হেল্পারও ড্রাইভারকে বাস থামানোর নির্দেশ দেয়।নজরুল হেল্পারকে কি বলতো জানেন?

‘মামা,মহিলা নামবো।বাস থামাও!!’

 

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s