জ্যান্ত কবর


‘কিরে হারামজাদারা। একটা কবর খুঁড়তে এতো সময় লাগে? হাত চালা শূয়রের বাচ্চারা।’

রইসুদ্দিন কথায় তার চ্যালারা আরও জোরে হাত চালায়। কয়েকটা নিথর শরীর পড়ে আছে। একটু আগেই গুলি করা হয়েছে।

‘হইসে হইসে। অনেক খোঁড়া হইসে। এইবার মুর্দাগুলারে চাপা দে।’

রইসুদ্দিনের কথায় তার চ্যালারা একেকটা করে লাশ চ্যাঙ দোলা করে কবরে ছুঁড়ে ফেলে।

লাশ ফেলানো হলে কবরের পাশে রাখা কোদাল আবার তারা হাঁতে তুলে নেয়।

কোদালে মাটি নিয়ে কবরে ফেলতে যাবে এমন সময় সুরুজ দৌড়ে আসে রইসুদ্দিনের কাছে।

সুরুজ রইসুদ্দিনের ছোট শালা। সব সময় রইসুদ্দিনের সাথে আঠার মতো লেগে থাকে। রইসুদ্দিনের মতো সুরজও যোগ দিয়েছে শান্তি কমিটিতে।

‘দুলাভাই দুলাভাই, মেজর সাব আপনেরে ডাকতেসে।’

‘ক্যান? ডাকতেসে ক্যান?’

‘তা তো জানিনা।’

সুরুজ মাথা চুলকায়।

‘চল তো দেখি কি হইসে।’

রইসুদ্দিন হাটা দেয়। সুরুজও তার পিছন পিছন হাটে। একটু যাবার আবার রইসুদ্দিন কবরের কাছে আসে।

‘আমি মেজর সাবের কাছে যাইতেসি। আইসা যেন দেখি মাটি দেওয়া হয়ে গেসে। ফক্কিকারের দল।’

রইসুদ্দিন চলে যায়।

চ্যালাদের একজনের নাম সাইফুল। রইসুদ্দিন চলে যাবার সাথে সাথে সে লুঙ্গির থেকে বিড়ি বের করে। কবরের পাশে বসে বিড়ি ধরায়।

‘সাইফুল ভাই, কাম করবানা?’

‘কিসের কাম? আমরা ওর বাপের চাকর নাকি? সব কাজ যেম আমাগোরেই করতে হবে। আমাগোর কোন কাম কাজ নাই। যত্তসব।’

‘তা সাইফুল ভাই কি করবা?’

‘চুপ থাক। বিড়ি খা। একটু জিরায় নে। তারপর কবর দেয়া যাবে।’

বাকিরাও সাইফুলের পাশে বসে যায় কবরের পাশে।

এদিকে কবরের লাশের ভেতর কেউ চোখ মেলতে চেষ্টা করছে। ২০-২২ বছরের এক যুবক, নাম আসাদ।

আসাদ চারপাশটা দেখে। একটু আগেই তাকে গুলি করা হয়েছে। গুলি পেটে লাগলেও এখনো শরীরে প্রাণ আছে আসাদের।

প্রাণ থাকলেও নড়ার বিন্দু মাত্র ক্ষমতা আসাদের নেই। আসাদ চোখ মেলে। চোখের সামনে তার পুরানো স্মৃতি খেলা করতে থাকে।

এইতো সেদিন ভর্তি হল বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটা মেয়ে, নাম রুবা। রুবা আসাদের ক্লাসেই পড়ে। রুবাকে অনেক পছন্দ করতো আসাদ। কিন্তু কোনদিন বলার সাহস হয়নি। আচ্ছা রুবা কি জানে যে আসাদ তাকে ভালবাসতো?

কতদিন রোকেয়া হলের সামনে আসাদ মেয়েটাকে খুঁজে ফিরেছে একটি বার দেখার জন্য। আচ্ছা, ওরা তো রোকেয়া হলেও আক্রমণ করেছিল। রুবার কিছু হয়নি তো?

আচ্ছা আসাদের মা কোথায়? মনে পড়েছে, ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে তাই রাজাকাররা তাকে গুলি করে মেরেছে। আসাদের সামনেই মেরেছে। আসাদ কিছু করতে পারেনি। মাকে বাচাতে পারেনি। চিৎকার করে কেঁদেছে তার মাকে ছেড়ে দেবার জন্য। কিন্তু ওরা ছাড়েনি।

শুধু কি আসাদের মাকে মেরেছে? আসাদের বাবাকে যে জবাই দিল? বাবাকে জবাই দেওয়ার রক্ত ছুটে এসে আসাদের জামায় লেগেছে। তারপর জ্ঞান হারালো আসাদ। আচ্ছা আসাদের ছোট বোনটাকে ওরা কিছু করেনি তো?

কে জানে কোথায় আছে সে এখন। বেঁচে আছে নাকি তাকেও মেরে ফেলেছে।

আসাদকে অনেক অত্যাচার করলো ওরা। কিন্তু কিছুতেই মুখ খোলেনা আসাদ। একটা একটা করে নখ উপড়ে ফেললেও নাম বলেনি সহযোদ্ধাদের।

মেজর শফিক আসাদের গালে বুট চেপে ধরেন। বলেন, ‘সিরফ একবার বোলদো কৌন হ্যায় তুমহারা সাথ। হাম তুম কো ছোর দেগা।’

গাল থেকে মেজর শফিকের বুট সরায় আসাদ। মাটিতে হাত বুলায়। তারপর মাটি লেগে থাকা হাতে চুমু দিয়ে আসাদ বলে, ‘আমি বিশ্বাস করি আমার লাল রক্ত এই মাটিতে মিশে লাল সবুজের এক পবিত্র পতাকা বাংলা মাকে উপহার দেবে। আমি প্রস্তুত। জয় বাংলা।’

তারপর গুলি করা হয় আসাদকে। গুলির আঘাতে মৃত্যু না হলেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে।

হঠাৎ রইসুদ্দিন রাজাকার চলে আসে। এখনো কবরে মাটি দেওয়া হয়নি দেখে মাথায় রক্ত ওঠে তার।

‘শূয়রের বাচ্চারা, মুর্দা কবর না দিয়া তোরা বিড়ি টানতেসিস?’

সাইফুলরা কথা বাড়ায় না। কোদাল তুলে নেয়। মাটি ছুঁড়ে ফেলে কবরে। আসাদের নিঃশ্বাস তখনো থামেনি।

 

One response to “জ্যান্ত কবর

  1. পিংব্যাকঃ জ্যান্ত কবর | যুক্তিবাদী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s