ফুর্তির বর্ষবরণ


Picture-263

এক:

‘ফুর্তি…ফুর্তি…’

‘আসছি খালা।’

ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চোখ রেখে কপালে লাল টিপ লাগায় ফুর্তি। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখে খালা তার রুমে হাজির।

‘ও মা একি! এই সকালে কই যাচ্ছিস?’

ফুর্তিকে দেখে অবাক হয় খালা।

‘শুভ নববর্ষ খালা।’

খালার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফুর্তি।

‘আমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করো।’

‘তা তো করলাম। সবসময়ই করি। কিন্তু তুই যাচ্ছিস কোথায়?’

‘রমনা বটমূলে যাচ্ছি খালা। আজ পহেলা বৈশাখ।’

খালা ফুর্তির দিকে হতভম্ব হয়ে তাকান। ফুর্তি কেঁদে ফেলে। চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে ফেলে সে।

‘আজ আর আমাকে না করোনা খালা। আমাকে যেতে দাও।’

‘তোর খালু জানে?’

‘না কাউকে বলিনি। তুমি একটু খালুকে বলোনা। আমি বেশী সময় থাকবোনা। একটু ঘুরেই চলে আসবো।’

খালা কিছু বলেননা। একভাবে তাকিয়ে আছেন। কিছু চিন্তা করছেন।

‘ও খালা, খালুকে বলোনা। দেরী হয়ে যাচ্ছে।’

‘আচ্ছা, আয় আমার সাথে।’

ফুর্তি খালার সাথে সাথে যায়। খালু মাত্র নাশতা করে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন।

ফুর্তির খালু একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। এককালে ব্যস্ততার কারনে নিজের জন্যই পারেননি একটুখানি সময় বের করতে। আর এখন সময় কাটতেই চায়না। খবরের কাগজ সারাদিনে কয়েকবার করে পড়েন। পড়তে পড়তে হাপিয়ে উঠলে টিভিতে খবর, টক শো ইত্যাদি দেখেন। তারপর আবারও পড়েন খবরের কাগজ। বলতে গেলে খবরের কাগজই এখন তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।

‘ফুর্তি রমনা বটমূলে যেতে চায়।’

কথাটা শোনা মাত্রই কিছুটা আতংকিত মনে হলো ফুর্তির খালুকে। চোখের সামনে থেকে খবরের কাগজ নামিয়ে রাখলেন।

‘মানে কি?’

‘আমি রমনা বটমুলে যেতে চাই খালু।’

‘কেন? ওখানে কি?’

ফুর্তির কথা শুনে বেশ বিরক্ত খালু।

‘আমার আম্মুর কথা খুব মনে পড়ছে খালু। তখন তো অনেক ছোট ছিলাম। কিছু বুঝতাম না। বড় হবার পর যখন সব জানলাম, সব বুঝতে শিখলাম আমার পহেলা বৈশাখে রমনায় যেতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু কখনো তোমাদের বলতে সাহস পাইনি।’

‘থামো।’

খালুর আদেশে চুপ করে যায় ফুর্তি।

ফুর্তি খালুর পাশে এসে বসে। খালু ফুর্তির মাথায় হাত রাখেন, স্নেহের পরশ বুলান।

‘তোমার আম্মু ছিলেন খুবই প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ। খুব ভাল গান গাইতে পারতেন। পহেলা বৈশাখ থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা জন্মদিন তোমার আম্মুর ব্যস্ততার অন্ত ছিলোনা। তোমার জন্মের কিছুদিন পরেই তোমার বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। এরপর থেকে তোমরা আমাদের কাছে।

২০০১ সালের পহেলা বৈশাখেও তোমার আম্মু গিয়েছিলেন বটমুলে…’

‘খালু, আমি সব জানি।’

চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা ফুর্তি।

‘বোমা হামলায় যে দশজন নিহত হন তাদের মধ্যে তোমার আম্মু ছিলেননা। কিন্তু হামলায় বেশ আহত হন তিনি। মাস খানেক হসপিটালে চিকিৎসার পর আমরা তাঁকে বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু ওই ধকল আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি…’

হঠাৎ ফুর্তির চোখের দিক তাকাতেই থেমে যান খালু। অঝরে কাঁদছে মেয়েটা।

খালু ফুর্তির চোখের পানি মুছে দেন।

‘কেন যেতে চাও ওখানে?’

‘ওখানে আমার আম্মু বর্ষবরণের গান গাইতেন। আম্মু ওখানে নিঃশ্বাস নিয়েছেন। হয়তো পান্তা-ইলিশও খেতেন…’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ফুর্তি।

‘আম্মুর কথা আমার খুব বেশী মনে নেই। আমি আমার আম্মুকে অনুভব করতে চাই। আমার চোখ দিয়ে আম্মুকে বুঝতে চাই।’

 

দুই:

ভীর ঠেলে ফুর্তি যাচ্ছে। চারপাশটা ভাল করে দেখে ফুর্তি। আকাশে ফানুস উড়ছে। চারিদিকে উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে পান্তা-ইলিশ খাচ্ছে। কেউবা আবার বাবা-মায়ের কাছে আদুরে বায়না করছে।

তরুণদের উচ্ছ্বাসটা যেন সবচেয়ে বেশী। ফুর্তির বয়সী তরুণ-তরুণীরা এখানে বন্ধুদের সাথে এসেছে বর্ষবরণ উৎসবে অংশ নিতে। তাদের গালে আবার রং তুলির আচর।

ভীর কাটিয়ে আরও সামনে যায় ফুর্তি। শিল্পীরা বর্ষবরণের গান গাইছে। ফুর্তিও গলা মেলায় তাদের সঙ্গে…

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক
এসো এসো…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s