শরণার্থীর গল্প


দলে দলে দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে পথ চলছে মানুষ। এতো মানুষ একসাথে কখনো দেখেনি নিরঞ্জন। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিরঞ্জনও অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে ছেলে নিতাই আর মেয়ে দুর্গাকে নিয়ে।

স্ত্রী লক্ষ্মী আর ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছোট্ট সংসার ছিল নিরঞ্জনের। জমিতে কাজ করে কোনরকমে দুবেলা দুমুঠো পেটে পুড়তে পারলেই খুশী ছিল ওরা। সুখেই দিন কাটছিল ওদের।

দেশে কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে এতো কিছু বুঝতোনা নিরঞ্জন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে কেন যেন সবাই তাকে ভারতে চলে যেতে বলছিল। হিন্দুদের নাকি মেরে ফেলছে। কিন্তু কি করেছে হিন্দুরা?

আর সে-ই বা কেন দেশ ছাড়বে? নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে কেউ কোথাও যায় নাকি?

কিন্তু এবার সত্যিই নিজের ভিটে মাটি ছাড়তে হচ্ছে নিরঞ্জনকে। গতকাল রাজাকারেরা লক্ষ্মীকে তুলে নিয়ে গেছে।

সালাম মেম্বারের পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেও স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারেনি সে। নিজের জন্য ভাবেনা কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটোকে তো বাঁচাতে হবে।

কেউ বৃদ্ধা মাকে কোলে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ স্ত্রীর হাত ধরে যাচ্ছে কেউ মাটিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। যে যেভাবে পারে যাচ্ছে।

চারপাশ থেকে থেমে থেমে গুলির ভয়াবহ শব্দ আসছে। পাখির মত করে মানুষ মরছে। এর মধ্যে থেকেই রাজাকারেরা মৃত শরীর হাতিয়ে গয়না, ঘড়ি ইত্যাদি যা পাচ্ছে নিচ্ছে।

সেই রাত থেকে হাঁটছে ওরা। কোন বিশ্রাম নেই।

‘আর কতো দূর বাবা? আর যে পারতিসিনা’।

‘আর একটু সামনে। চইলা আইসি বাপ। আর একটু পা চালাও’।

দুর্গা একটু পিছনে ছিল। দৌড়ে বাবার হাত ধরলো সে।

‘বাবা, ওরা মায়েরে কোয়ানে নিয়ে গেসে?’

নিরঞ্জন কিছু বলতে পারেনা। কি বলবে? কিছুই যে বলার নেই। সে জানেনা লক্ষ্মী কোথায় এখন। বেঁচে আছে নাকি মেরে ফেলেছে। পা থেমে যায় নিরঞ্জনের। চলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরঞ্জন।

আবার গুলির শব্দ।

অসহায়ের মতো ছেলে মেয়ে দুটোর দিকে তাকায় নিরঞ্জন।

‘পা চালা মা। পা চালা’।

‘আমি আর পারতিসিনা বাবা। পা ব্যাথা করতিসে। আমারে কোলে নিবা?’

কাঁধের ব্যাগ ফেলে দিয়ে ছোট্ট নিতাইকে কোলে নিল নিরঞ্জন।

নিতাইকে কোলে আর দুর্গার হাত ধরে আবার পা চালায় নিরঞ্জন।

হঠাৎ পিছন থেকে কি যেন এসে বিঁধল নিরঞ্জনের পিঠে। রাস্তায় বসে পরে নিরঞ্জন।

‘কি হইসে বাবা?’

‘তোমার কি অনেক বেশী কষ্ট হতিসে বাবা? আমার আর পা ব্যাথা করতিসে না। আমি হাটতে পারবো’।

নিরঞ্জন পিঠে হাত দেয়। হাত ভিজে গেছে।

নিরঞ্জন বাচ্চা দুটোর দিকে তাকায়।

উহু এভাবে পড়ে গেলে চলবেনা। বাচ্চা দুটোকে তো বাঁচাতে হবে।

নিজের সর্বশক্তি দিয়ে উঠে দাড়ায় নিরাঞ্জন।

‘চল,মা চল। পা চালা বাপ’।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলে ওরা। সামনেই ভারতের বর্ডার। ওইতো দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু আর যে পা চলেনা নিরঞ্জনের। বসে পড়ে সে। সর্বশক্তি দিয়েও আর উঠে দাড়াতে পারছেনা।

‘বাবা, তুমি আবার বইলা ক্যান? যাবানা?’

‘বাপ, আমি তোর মায়রে আনতে ভুইলা গেসি। তোমরা সামনে আগাও। আমি তোমাগে মায়রে নিয়া আসি। তোমরা যাও। তাড়াতাড়ি যাও, দেরি কইরেনা’।

‘তুমি আসবা তো বাবা?’

‘হয় মা। তোমরা যাও। তোমার ভাইডারে দেইখে রাইখো’।

দুর্গার চোখে জল। কি বুঝলো কে জানে। ভাইয়ের হাত ধরে এগিয়ে চলে দুর্গা। চোখের জল বেয়ে পড়ছে গালে।

পিছন ফিরে তাকায় দুর্গা। তার বাবা বসে আছে। বাবার চোখেও জল টলমল করছে।

One response to “শরণার্থীর গল্প

  1. পিংব্যাকঃ শরণার্থীর গল্প | যুক্তিবাদী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s