শীতেরগল্প


winter-village-of-bangladesh-anisur-rahman

প্রথমগল্পঃ

‘সুমির মা, একটু শুনে যাও তো।’

কম্বলের নিচ থেকে মাথাটা একটু বের করেছিলেন সুমির মাকে ডাকার জন্য।কিন্তু যেই শীত পড়েছে! আবারও মাথা ভেতরে ঢুকালেন গৃহকর্ত্রী।

‘উহহহ! ডিসগাস্টিং! এতো শীতে মানুষ মর্নিং ওয়াকে যাবে কিভাবে।’

মাথাটা আবার কম্বলের নিচ থেকে বের করে হাতে ভর দিয়ে জানালার পর্দা সরালেন তিনি।অনেক কুয়াশা! দেখা যাচ্ছেনা কিছুই!

‘ভয়াবহ!’ অস্ফুটে গৃহকর্ত্রীর মুখ থেকে বের হলো শব্দটা।

‘আশ্চর্য! সুমিরমা’টা এখনো কেন আসছেনা।সুমির মা…সুমির মা।’

সুমির মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলেন।

‘বলি, থাকো কই? কতবার তোমাকে ডাকলে আমার কথা কানে যায় তোমার? কানে কি একেবারেই শুনতে পাওনা? কালা? এতবার ডাকতে হবে কেন?’

‘নাশতা বানাইতেসিলাম আফা।বাবুরা ইসকুলে যাইবো।’

‘তাতো যাবেই।কিন্তু নিয়ে যাবে কে? ওদের আব্বু কোথায়? উঠেছে ঘুম থেকে?’

‘সারতো অনেক আগেই চইলা গেসেন অফিসে।’

সুমির মার কথা শুনে মেজাজ আরও বিগরে গেলো গৃহকর্ত্রীর।

‘অফিসে চলে গেছে? কোন কান্ডজ্ঞান নেই।এখন ওদের স্কুলে কে নিয়ে যাবে? আমি? আমিতো মর্নিং ওয়াকেই যেতে পারছিনা।সুমির মা শোন, তুমি বাচ্চাদের একটু স্কুলে দিয়ে এসো।ঠিক আছে?’

সুমির মা মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে উদ্যত হবে।

‘আরে আরে দাড়াও! যাচ্ছো কোথায়? কথা কি শেষ হয়েছে নাকি!’

সুমির মা দাঁড়াবে। ‘সুমির মা, ওইযে সেলফ দেখছো ওখানে দেখো একটা নতুন কম্বল আনিয়ে রেখেছি। আমাদের টমির কম্বলটাতো বছর দুই হয়ে গেছে।এইটা ওকে দিয়ে আগেরটা লন্ড্রিতে দাও।’

সুমির মা কম্বলটা নেয়।হাত বুলায়। অনেক নরম। ধরলেই ভাল লাগে। কি যেন ভাবছে সুমির মা।

‘আরে কি হল? তাড়াতাড়ি যাও।নাশতা না হলে বাচ্চারা কি খালি পেটে স্কুলে যাবে?’

‘আফা, আমার সুমিটার না অনেক জ্বর হইসে।মাইয়াটা আমার অনেক কষ্ট পাইতাসে শীতে। এই কম্বলটাতো ভালা। এইটা কুত্তার জন্য রাইখা, পুরানটা আমি নিয়া যাই?’

‘হোয়াট? কুত্তা? তোমাকে না বলেছি এই বিচ্ছিরি ওয়ার্ডটা আমার সামনে উচ্চারণ না করতে? টমি বলতে পারোনা, টমি?’

‘হ, টমি ভাই।’

‘হ্যা, এইবার ঠিক আছে।’

‘আফা, কম্বল…’

‘আশ্চর্য! কম্বলটা টমির। ও এতো নোংরা করে বলেইতো আরেকটা কম্বল আনালাম।ওরতো দুটো কম্বলই লাগবে। কিভাবে দেই?’

সুমির মা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

‘আরে কি হলো? যাও যাও, কাজে যাও।’

সুমির মা চলে যাবে।

‘ডিসগাস্টিং!’

এরপরের কথা সবাই জানে।তাই আর বিশদভাবে তুলে ধরতে মন চাইছেনা।তাও সংক্ষেপে বলি।হ্যা, সুমি মারা গেছে। মেয়েটা এমনিতেই জ্বরে ভুগছিল। পাইপে থাকে। শীতের আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা সেখানে নেই।মরে গেছে। কতো সুমিই তো মরে! শুধু কি সুমি? রুমি, মনি, জামাল, কামাল কতজনই তো মরছে এই প্রচণ্ড শীতে! ক্ষতি কি? যাইহোক, গল্পটা যে বললাম তাঁর নিশ্চয়ই একটা কারন আছে। কিন্তু গল্পের কারন বলার আগে আরও একটা গল্প বলে তারপর বলতে চাই। চলুন তাহলে দেখি আমাদের দ্বিতীয় গল্পে কি আছে।

দ্বিতীয়গল্পঃ

প্রচণ্ড শীত পড়েছে। গাছের পাতা ঝরে পড়ছে শীতে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর অবস্থা বেশী খারাপ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে আমাদের দ্বিতীয় গল্পের চরিত্রগুলোও সীমান্তবর্তীএকটি গ্রামেই থাকে।

‘মা, শীত করতিসে খুব।’

‘এহ! নবাবের ছাওয়ালের শীত করতিসে! আমি একখান শাড়ি পইড়ে আছিনা। ইশকুলে না যাবার ফন্দি?’

‘না মা, আমার সত্যি সত্যিই অনেক শীত করতিসে। খুব কষ্ট হতিসে মা।’

মা আরও রেগে যান।

‘শীত করতিসে। ওই একখানই কথা। কাজ নাই কাম নাই, তর শীতকরলি সমস্যা কোয়ানে?’

শীত আসলেই পড়েছে। বেলালের মা নিজেও তা জানেন। কিন্তু বেলালের সামনে তা প্রকাশ করতে নারাজ।শীত থেকে বাঁচতে গায়ে জড়ানোর এতোটুকু কাপড় নেই। বেলাল ছোট থাকতেই তার বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে গেছে। তারপর থেকে মানুষের বাসায় কাজ করে বেলালকে এতো বড় করেছেন তার মা। ৬ বছরের বেলাল ছাড়া তার মায়ের আর কেউ নেই। মা বেলালের কাছে আসে। জবুথবু হয়ে শুয়ে আছে বেলাল। মা কপালে হাত রাখেন। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে বেলালের।

‘ও বাপ। তর তো ম্যালা জ্বর। আমারে কইসনি ক্যান এতক্ষণ? কি করি এহন আমি। আমার তো কামে যাতি হবে।’

বেলালের মা বারান্দায় বেলালকে নিয়ে আসেন। তার কাছেই মাটির চুলায় আগুন ধরান যেন ছেলের খানিকটা শীত কম লাগে।

‘বাপ, এইখানে শুইয়ে থাক। ঘরেতো কিছু নাই।আমি কাম সাইরে তাড়াতাড়ি চইলে আসতিসি।’

বেলাল শুয়ে থাকে। মা কাজে বের হন। গল্পের বাকি অংশ বর্ণনা করতে শব্দ ব্যবহারে যতটা পটু হওয়া প্রয়োজন তার কিছুই আমার নেই। সংক্ষেপে বলে দেওয়াই তাই শ্রেয়। মা কাজ শেষে যখন বাড়িতে ফিরলেন দিনের আলোও ততোক্ষণে বাড়ি ফিরে গেছে। মা এসে দেখলেন ছেলের শরীরটা থাকলেও প্রাণ পাখি নেই। না, বেলাল মোটেও জ্বরে মারা যায়নি। প্রচণ্ড শীতের কষ্টে নিজের অজান্তেই চলে এসেছিল মাটির চুলার কাছে। চুলার সাথে ধাক্কা লাগতেই চুলা তার আগুন নিয়ে আছড়ে পড়ে শিশু বেলালের উপর। গল্পগুলো মোটেও মজার নয়। বরং আমাদের খানিকটা কষ্টই দেয়। প্রথম গল্পটিতে গৃহকর্ত্রী কি পারতেন না একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে? তার একটু সাহায্য পেলে হয়তো আজকেও সুমি হেসে খেলে স্কুলে যেতে পারতো। একেবারে না পারলেও কিছুটা তো পারতেন! কিন্তু সুমিদের চেয়েও যে এই সমাজে টমিদের দাম বেশী!

দ্বিতীয়গল্পে তৃতীয় কোন চরিত্র না থাকায় দোষটা তার উপর চাপাতে পারছিনা। কিন্তু তারপরেও কি বেলালের শরীরে একটা কম্বল জড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতোনা? কিছুটা দায়িত্ব বোধহয় আমাদের কাঁধে এসেও বর্তায়!

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s