হাসি


242873611_640

একঃ

এই ‘হাসি’টাকেই ভয় পেয়ে আসছে মামুন। প্রশ্ন আসতে পারে, হাসিকে মানুষ ভয় পায় নাকি! হ্যা, পায় তো। শুধু তাই না, এক মানুষের হাসি আরেক মানুষের মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারে।

আজকেও বেশ দেরী হয়ে গেছে। টিউশনিটা মনে হয় আর থাকবেনা মামুনের। রোজ এভাবে দেরী হলে চলে? কিন্তু ইচ্ছা করে যে মামুন রোজ দেরী করছে তাও কিন্তু নয়।

একটা চাকরীর জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে সে। অনার্স-মাস্টার্সে এতো ভাল রেজাল্ট থাকা সত্বেও কেন যে একটা চাকরী জুটছেনা মামুনের, তা কারোরই বোধগম্য নয়। কিন্তু মামুন জানে। একটা জায়গায় তার দুর্বলতা রয়েছে।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মামুন চলে এসেছে নেহাদের বাসার দোরগোঁড়ায়।

টিং টিং!

নেহার আম্মু দরজা খুললেন।

‘আসসালামুয়ালাইকুম। নেহা আসে?’

‘হম, এসো।’

নেহা মামুনের ছাত্রী। ক্লাস নাইনে পড়ে। মামুনের পেট শান্ত রাখার একমাত্র অবলম্বন তার এই টিউশনি। টিউশনির টাকা দিয়েই কোন রকমে চলতে হচ্ছে তার।

মামুন সোফায় বসে। টেবিলের উপরে পত্রিকা রাখা। পত্রিকা পড়ে কি হবে? কি আছে পত্রিকায়? শুধু শুধু সময় নষ্ট। এর থেকে টিএসসির একটা আবৃতির কোর্স করা ঢের ভালো। তাতে উচ্চারণ শুদ্ধ হয়। সঠিক উচ্চারণে কথা বলার চেষ্টায় কমতি নেই মামুনের।

পত্রিকাআলারা একটা নির্দিষ্ট শ্রেনির পাঠক ধরে ধরে নিউজ করে। ওই শ্রেনির মধ্যে কি আর মামুনেরা পড়ে?

হ্যা পড়ে! চাকরীর বিজ্ঞাপনের জন্য তো একটা পাতাই রয়েছে!

পেপার তুলে নেয় মামুন। এক পাতা উল্টাতেই চলে আসে নেহা।

‘ভাইয়া, ভাল আছেন?’

‘হম, ভালই। তুমি ভাল আসো?’

নেহা হাসে। আর এই ‘হাসি’টাই মামুনকে অনেক বেশী আঘাত করে। এই ‘হাসি’ বারবার তার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। এই ‘হাসি’র কারন মামুন জানে।

মামুনের উচ্চারণগত কিছু সমস্যা আছে। যার জন্য ভাল রেজাল্ট থাকা সত্বেও কোন অফিসের চেয়ারে বসার অনুমতি তার মেলেনি এখনো। ইন্টারভিউ বোর্ডে বারবার এই হাসি দেখেই তার ফিরে আসতে হয়েছে।

‘তুমি কতি পারবা আকাশের রং নীল ক্যান?’

আবারও হেসে ফেলে নেহা। অনেক চেষ্টা করেও সে তার হাসি আটকাতে পারছেনা। নেহার ‘হাসি’ দেখে নিজেকে সামলাতে পারেনা মামুন।

‘চুপ!’ চিৎকার করে বলে সে।

মামুনের এমন আচরণে বেশ ভয় পায় নেহা।

কিছু না বলেই নেহাদের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসে সে।

কি করবে বুঝতে পারছেনা মামুন। কতো চেষ্টা করছে, কিন্তু তারপরেও আঞ্চলিকতার টান থেকে বের হতে পারছেনা সে। মনের অজান্তেই বেড়িয়ে আসে আঞ্চলিকতার বুলি।

চোখে অন্ধকার দেখে মামুন। নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছা হচ্ছে তার। শুভ বলেছিলো আবৃতির কোর্স করলে নাকি উপকার হয়। কিন্তু তার জন্যও তো চাই টাকা। কি মনে করে শুভকে কল করে সে।

‘দোস্ত, ফ্রী আসিস? একটু দেহা করতি পারবি? আইচ্ছা, ঠিক আসে। আমি আসতিসি।’

একটু সামনেই শুভর বাসা। শুভ তার কলেজ জীবনের বন্ধু। ম্যাট্রিকের পর ঢাকায় এসে যখন কলেজে ভর্তি হলো, তখন তার কথা শুনে ক্লাসের অনেক ছেলেই হাসতো, মজা নিতো। মামুনকে গাইয়া বলতো। সেই সময় এই শুভই ছিল মামুনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

মামুন চলে এসেছে শুভর বাসায়। কলিং বেল চাপলো সে।

‘দরজা খোলাই আছে। চলে আয়।’

মামুন কিছুটা সংকোচ বোধ করছিল। শুভর সাথে শুভর বাবা-মাও এই বাসাতেই থাকেন।

আলতো করে দরজা খুলতেই শুভ দেখতে পেলো মামুনকে।

‘লজ্জার কিছু নেই, চলে আয়।’

শুভ সোফায় হেলান দিয়ে পেপার পড়ছে। পাশের সোফায় বসলো মামুন।

‘আব্বা-আম্মা খালার বাসায়। শুক্রবার আসবেন। তোর খবর বল।’

‘আমার কতা কি কবো। এতো চেষটা করলাম, কিনতু কোন লাভ হলনা। কিচছু হবেনা আমারে দিয়ে।’

‘তোরে তো বললাম, যে আবৃতির কোর্সটা কর।’

‘টাকা কি আমার বাপে দেবেনে?’

‘হম, সেটাও একটা কথা।’

কিছুটা চিন্তায় পড়ে যায় শুভ। তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার জন্য মামুন কতো চেষ্টা করেছে তা শুভ নিজেও জানে। কিন্তু পারছেনা।

‘কি করবি এখন?’

‘কি আর করবো। বাড়ি চলি যাবো। বাড়ি যাইয়ে ছাত্তর পড়াবো। ওই দিয়েই আমার চলি যাবে।’

‘সেদিন যে ইন্টারভিউ দিলি কি হলো ওইটার?’

‘কি আর হবি? যা হয় তাই হইসে। রিটেনে টিকিসি। এখন ভাইভায় ডাকিসে।’

‘ভাল খবর তো। এভাবে বলিস কেন?’

বেশ অবাক হয় শুভ।

‘কি অয় তুমি জানোনা? ওই এক ‘হাসি’ দেখেই আমার ফিরতি হয়। আজ পর্যন্ত কি কম জায়গায় দিসি? লাভ হয়সে কোন?’

‘দোস্তো শোন, নিরাশ হওয়ার কিচ্ছু নাই। তুমি ট্রাই করো। দেখবা হয়ে যাবে।’

‘অনেক ট্রাই করিসি। কোন কিছু অয়না। আর দরকার নাই। এই চাকরী-বাকরী তোমাগের মতো মানুষগে। আমাগে কোন জায়গা নাই এহানে।’

শুভও বুঝতে পারছে মামুনের মনের অবস্থা। একসাথেই পড়ালেখা শেষ করেছে দুজনে। শুভর থেকে মামুনের রেজাল্টই বেশী ভাল। কিন্তু তারপরেও লাভ হচ্ছেটা কি?

‘দোস্তো, শেষ চেষ্টা কি করা যায়না? মানে গ্রামে চলে যাবি, যা। সমস্যা নেই। কিন্তু একটা সুযোগ যখন আছে নিতে সমস্যা কি?’

সোফা থেকে উঠে জানালার পাশে এসে দাড়ায় মামুন। সূর্য ডুবতে বসেছে।

‘আর, পারি উঠতিসিনা। নিজের কথা কলি মানুষ হাসে। তোমাগের কইতে চেষ্টা করলিও হাসে।’

মামুনের কাঁধে হাত রাখে শুভ।

‘বুঝতে পারছি দোস্ত। কিন্তু তারপরেও বলবো ভাইভাটা দে। দেখ কি হয়।’

 

দুইঃ

‘মামুন সাহেব আপনার রেজাল্ট তো বরাবরই খুব ভাল। কিন্তু কোথাও চাকরীর অভিজ্ঞতা নেই। কেন? এতদিন চাকরীর চেষ্টা করেননি?’

বেশ চিন্তায় পড়ে যায় মামুন। কি উত্তর দেবে এই প্রশ্নের?

‘চেষটা তো করিসি। কিন্তু আমি তো শুদ্ধ করে আপনাগে মতো কইরে কথা বলতি পারিনা। তাই আমার চাকরী হয়না।’

সাত-পাঁচ না ভেবে সত্যি কথাই বলে দেয় সে।

মানুনের কথা শুনে হেসে ফেলেন স্যার।

মামুন ভাইভা বোর্ডের স্যারের মুখের দিকে তাকায়। আবারও কি ওই ‘হাসি’?

নাহ! এটা তো ওই হাসি নয়! এই হাসির মধ্যে কোন তাচ্ছিল্য নেই। কোন আক্রমণ নেই। নেই অবজ্ঞা।

‘মামুন সাহেব, সবাই আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলি। বাংলা ভাষায় কথা বলি। বাংলা মায়ের অনেক রূপ। আছে অনেক বৈচিত্র্য।

আজ যে বা যারা আপনার কথা শুনে হেসেছে তারা হয় না বুঝেই হেসেছে অথবা তারা জানেনা কিভাবে মাকে সম্মান জানাতে হয়।

মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্যই বাংলা মায়ের ছেলেরা জীবন দিয়েছে বায়ান্নতে। তথাকথিত শুদ্ধ ভাষার জন্য নয়।

আঞ্চলিক ভাষাকে অবজ্ঞা করার কোন উপায় নেই। আমিতো বলবো এই আঞ্চলিক ভাষাগুলোই আমাদের ভাষা বৈচিত্র্য টিকিয়ে রেখেছে।’

একনাগারে কথাগুলো বললেন স্যার।

‘কাল থেকেই জয়েন করুন? আমরা কাজে বিশ্বাসী। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি আপনি পারবেন।’

মামুন হাসছে! এই হাসিটাই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s